অদম্য মেধাবীদের সংবর্ধনা বাধা পেরিয়ে সাফল্যের প্রত্যয়

বিশেষ প্রতিনিধি | আপডেট: ০১:৪৫, অক্টোবর ৩০, ২০১৫ |

জীবনের প্রতিকূলতা পেরিয়ে সাফল্য অর্জনকারী এই শিক্ষার্থীদের গতকাল রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সিএ ভবন মিলনায়তনে ব্র্যাক ব্যাংক–প্রথম আলো ট্রাস্টের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। পুরস্কার বিতরণ শেষে মঞ্চে অতিথিদের সঙ্গে অদম্য মেধাবীরা l ছবি: জাহিদুল করিমজীবনের প্রতিকূলতা পেরিয়ে সাফল্য অর্জনকারী এই শিক্ষার্থীদের গতকাল রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সিএ ভবন মিলনায়তনে ব্র্যাক ব্যাংক–প্রথম আলো ট্রাস্টের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। পুরস্কার বিতরণ শেষে মঞ্চে অতিথিদের সঙ্গে অদম্য মেধাবীরা l ছবি: জাহিদুল করিম

অদম্যদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ

তারা এখন প্রেরণার উৎস। দৃষ্টান্তও বটে। যাবতীয় প্রতিকূলতা অতিক্রম করে অর্জন করছে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য। তাই তারা অদম্য। প্রথম আলো তাদের ভূষিত করেছে ‘অদম্য মেধাবী’ অভিধায়। সেই অদম্য মেধাবীদের সংবর্ধনা দেওয়া হলো গতকাল বৃহস্পতিবার। জীবনের সকল বাধা অতিক্রম করে সাফল্যের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার প্রত্যয় জানিয়েছে তারা। জানিয়ে গেছে দেশ ও জাতির কল্যাণে অবদান রাখার প্রতিশ্রুতি।

তাদের কেউ এসেছে সেই নাচোলের প্রত্যন্ত সাঁওতালপাড়া থেকে, কেউ সুন্দরবন লাগোয়া মাদার নদের চর থেকে। কারও চোখে আলো নেই, কিন্তু হৃদয় ভরে আছে আলো। মাদার নদের চরের আজিবার রহমান বলছিল, মাথা গোঁজার জায়গাও তাদের নেই। বাবার পেশা মাছ ধরা। শৈশব থেকেই বাবার সঙ্গে নৌকায় মাছ ধরতে গেছে। তবে জালের সঙ্গে সঙ্গী ছিল বই। এ বছর এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে সে বিজ্ঞান বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছে। তার স্বপ্ন প্রকৌশলী হওয়া।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের চিন্তা খাতুনের বাবা অসুস্থ। মা গৃহকর্মী। এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের টাকা পর্যন্ত ছিল না তার। সেই টাকা জোগাড় করে দিয়েছে এক বান্ধবী। চিন্তা জিপিএ-৫ পেয়েছে এবার। সে হতে চায় চিকিৎসক। শিক্ষক হতে চায় সাঁওতালপাড়ার মনতোষ হেমব্রেম। পরের জমিতে কাজ করে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছিল। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মোকাদ্দেসের ইচ্ছা আইনজীবী হওয়ার। এভাবেই গতকালের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে জীবনের কঠিন সংগ্রামের কথা অসংকোচে প্রকাশের পাশাপাশি নিজেদের স্বপ্ন তুলে ধরেছিল এই অদম্য মেধাবীরা।

অনুষ্ঠানের শুরুতে শর্মিলা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে শিল্পীদের নৃত্য পরিবেশনাব্র্যাক ব্যাংক-প্রথম আলো ট্রাস্ট রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সিএ ভবন মিলনায়তনে এই সংবর্ধনার আয়োজন করে। এবার এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া ৫০ জন এবং আগের অর্থসহায়তাপ্রাপ্তদের মধ্যে যাঁরা সাফল্য ধরে রাখতে পেরেছেন এবারের এইচএসসি পরীক্ষায়, তেমন ৩০ জনকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক সৈয়দ ফজলে এলাহীর অর্থায়নে পাঁচজনসহ মোট ৮৫ জনকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে এইচএসসিতে সাফল্য ধরে রাখা ৩০ জনকে পদক পরিয়ে দেন প্রধান অতিথি শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। তাঁদের এই বৃত্তি অব্যাহত থাকবে। আর এসএসসির কৃতীরা পাবে এইচএসসি পর্যন্ত বৃত্তি। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ অদম্য মেধাবীদের সকল শিক্ষার্থীর প্রেরণার উৎস হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, কেবল পড়ালেখায় ভালো করলে হবে না, তোমাদের ভালো মানুষ হতে হবে। নৈতিক মূল্যবোধ, সততা ও দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়ে বাংলাদেশকে নতুন করে গড়ে তুলতে হবে।
ছিল শিল্পী মাহমুদুজ্জামান বাবু ও এস আই  টুটুলের গানসূচনা বক্তব্যে সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম বলেন, ১৯৯৯ সাল থেকে দরিদ্র পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীদের প্রথম আলোর পক্ষ থেকে শিক্ষাসহায়তা দেওয়া শুরু হয়। নিয়মিতভাবে অর্থসহায়তা দেওয়া শুরু হয় ২০০৭ সাল থেকে। তখন আমেরিকান অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন, ম্যাডোনা গ্রুপ, ট্রান্সকম গ্রুপসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিগতভাবে অনেকে সহায়তা দিতে এগিয়ে এসেছেন। এরপর ২০১০ সাল থেকে ব্র্যাক ব্যাংক যুক্ত হয়েছে প্রথম আলো ট্রাস্টের এই কার্যক্রমে। এ ছাড়া দরিদ্র পরিবারের প্রথম নারী, যিনি স্নাতক পর্যায়ে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে পড়ছেন, প্রতিবছর এ রকম ১০ জন শিক্ষার্থীকে প্রথম আলো ট্রাস্টের উদ্যোগে ট্রান্সকম গ্রুপ সহায়তা করে।
২০০৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে ৫৮২ জনকে শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে অনেকেই সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসকসহ বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন। বর্তমানে নিয়মিত বৃত্তি পাচ্ছে ২৯৩ জন।

অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী, শিল্পী ইবরার টিপুঅদম্য শিক্ষার্থীদের অভয় দিয়ে ব্র্যাক ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মামদুদুর রশিদ বলেন, ‘তোমরা লেখাপড়া চালিয়ে যাও। ভালো ফল করো। আমরা পাশে থাকব।’
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন প্রথম আলো ট্রাস্টের কোষাধ্যক্ষ সামন্ত লাল সেন, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী, অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক পারভিন হাসান।
প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আনিসুল হকের উপস্থাপনায় শুরুতে শর্মিলা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে নৃত্য পরিবেশন করেন নৃত্যনন্দনের শিল্পীরা। আর গান গেয়ে শোনান মাহমুদুজ্জামান বাবু, এস আই টুটুল, চঞ্চল চৌধুরী ও ইবরার টিপু।