অদম্য মেধাবী কষ্টের পড়া, খুশির পাস

বিশাল বাংলা ডেস্ক | আপডেট: ০১:৪৩, মে ২০, ২০১৪ | প্রিন্ট সংস্করণ

গৃহশিক্ষকতা করে ও প্রতিদিন ১২ মাইল পথ হেঁটে লেখাপড়া করেছে আদিবাসী কিশোরী নীলা। খেতে-খামারে কৃষিশ্রমিক হিসেবে মজুরি খেটেছে আমির হোসেন। ফসল তোলার কাজ করতে হয়েছে তামিমা খাতুনকে। আর রেস্তোরাঁয় কাজ করেছে আবদুল হান্নান।
এমন বৈরী পরিবেশও দমিয়ে রাখতে পারেনি তাদের৷ তাই তারা অদম্য৷ অভাবের সঙ্গে লড়াই করেও উতরে গেছে তারা৷ পড়াশোনায় নিরন্তর অধ্যবসায় এনে দিয়েছে তাদের সাফল্য৷ এবার এসএসসি পরীক্ষায় পেয়েছে জিপিএ-৫৷ আজ আমরা শুনব এমনই কিছু অদম্য মেধাবীর গল্প।
কষ্টের ফল নীলার: ‘একদিকে সংসারের খরচ, অন্যদিকে দুই বোনের পড়াশোনার খরচ বাবা মেটাতে পারতেন না। এ কারণে টিউশনি করেই পড়াশোনা করতে হয়েছে৷’ কথাগুলো ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া আদিবাসী ছাত্রী নীলার। সে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার ডালবুগঞ্জ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিল। উপজেলার বৌলতলী গ্রামের রাখাইনপাড়ায় নীলাদের বাড়ি। বাবা বাঁচো মং তালুকদার গ্রাম্য কবিরাজ। দিনে ৩০-৪০ টাকা আয় করেন। মা তাঁতের কাপড় বোনার কাজ করেন। মা-বাবার আয় দিয়ে সংসার চলত না। তাই অনেকটা বাধ্য হয়েই লেখাপড়ার খরচ জোগাড় করতে নীলা গৃহশিক্ষকতার কাজ করেছে।
নীলাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, ছোট একটি টিনের ঘরে তাদের বসবাস। ঘরের চালের টিনে অসংখ্য ছিদ্র। নীলা জানায়, সকাল সাতটা বাজার সঙ্গে সঙ্গেই বাড়ি থেকে ছয় মাইল দূরের বিদ্যালয়ে যেতে হতো। সারা দিন বিদ্যালয়ের ক্লাস করে বিকেল চারটায় বাড়ি ফিরে টিউশনি করতে হতো।
আমির হোসেন তখন মাঠে: দুধ বেচে সংসার চালান আমিরের বাবা জুলু মিয়া। সংসারে টানাপোড়েনের কারণে আমিরকেও লেখাপড়া বাদ দিয়ে কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করতে হয়। সে এক বছর আগের কথা। বিদ্যালয়ে আসতে না দেখে শিক্ষকেরা তার খোঁজ নেন। বিদ্যালয়ে নিয়ে এসে ছাত্রাবাসে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেন। সেই আমিরই এ বছর সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ মডেল উচ্চবিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছে। প্রধান শিক্ষক লুৎফুর রহমান যখন ফোন করে জুলু মিয়াকে ছেলের সাফল্যের কথা জানান, তখন আমির হোসেন মাঠে কাজ করছিল। মার্চ মাসে পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর সে বাড়ি ফিরে কাজে যোগ দেয়। প্রধান শিক্ষক লুৎফুর রহমান জানান, আমির হোসেনের বাবা খুব দরিদ্র। তবে আমির লেখাপড়ায় খুব ভালো। সহায়তা পেলে সে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায়ও ভালো করবে।
ফসল তুলেছে তামিমা: তামিমার বাবা মাইনুল ইসলাম মারা গেছেন বছর পাঁচেক আগে। তখন থেকেই চার মেয়ে ও এক ছেলেকে লালন-পালনের দায়িত্ব এসে পড়ে তার মা সোনাভানের ওপর। বাড়ি বাড়ি গিয়ে গৃহকর্মীর কাজ করে সংসার চালাতে হয়েছে তাঁকে। সংসারে তীব্র অভাব থাকায় তামিমাকেও গৃহকর্মীর কাজ করতে হয়েছে। কখনো কখনো সে মানুষের খেতেও ফসল তোলার কাজ করেছে। এত সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতার মাঝেও লেখাপড়া চালিয়ে গেছে সে। সে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর আবদুল হামিদ উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। সে বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী। জীবনের লক্ষ্য কী, জানতে চাইলে তামিমা বলে, ‘আমি একজন কৃষিবিদ হতে চাই।’
রেস্তোরাঁয়ও খেটেছে হান্নান: ‘বাবা বেঁচে থাকলে খুব খুশি হতেন, মা ভালো থাকলে বুকে টেনে নিয়ে আদর করতেন, প্রতিবেশীদের ডেকে মিষ্টিমুখ করাতেন।’ কথাগুলো নীলফামারী জেলা সদরের সোনারায় সংগলসি উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পাওয়া আবদুল হান্নানের। সে সদর উপজেলার ছোট সংগলসি গ্রামের মৃত আতাউর রহমানের ছেলে। চাচাতো বোনের কাছে থেকে বড় হয়েছে সে। তার ভগ্নিপতি দরিদ্র। তাই লেখাপড়ার খরচ জোগাড় করার জন্য কখনো রেস্তোরাঁয়, আবার কখনো কৃষিশ্রমিকের কাজ করেছে আবদুল হান্নান। সে বলে, ‘আমার বাবা একটি মাদ্রাসায় চাকরি করতেন। ২০০৭ সালে তিনি মারা যান। মা বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী হওয়ায় নানার বাড়িতে থাকেন। এখন আমি ভালো কলেজে ভর্তি হতে চাই। ভালো ফল করে চিকিৎসক হওয়া আমার স্বপ্ন।’
বিদ্যালয়ের শিক্ষক উত্তম কুমার রায় জানান, ছেলেটি অত্যন্ত গরিব ও মেধাবী। এখন সে একটু সহযোগিতা পেলে তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে।
[প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন নেছারউদ্দিন, কলাপাড়া (পটুয়াখালী); খলিল রহমান, সুনামগঞ্জ; আনোয়ার হোসেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও মীর মাহমুদুল হাসান, নীলফামারী]