অদম্য মেয়েরা কলসিন্দুর রূপকথা

আনিসুল হক | আপডেট: ০০:০৫, নভেম্বর ১১, ২০১৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

p এই কিশোরীদের ক্রীড়া নৈপুণে্যর আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে কলসিন্দুর গ্রাম, গোটা বাংলাদেশওকলসিন্দুর গ্রামের নাম এখন দেশ-বিদেশের সবাই জানেন। কারণ, কলসিন্দুর প্রাথমিক বিদ্যালয় বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা কাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের চ্যাম্পিয়ন। আবার বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা ফুটবলের অনূর্ধ্ব-১৪ কিংবা অনূর্ধ্ব-১৬ চ্যাম্পিয়ন দলের বেশির ভাগ মেয়েই এই এক গ্রামের। এ বছরের অনূর্ধ্ব–১৪ এএফসি কাপে বাংলাদেশ নেপালকে ৯-০ আর তাজিকিস্তানকে ৯-১ গোলে হারায়। ভারতকে ফাইনালে ৪-০ গোলে হারিয়ে মে মাসে তারা দেশে ফেরে। সেই ফাইনালে ছয়জন খেলেছিল কলসিন্দুরের মেয়ে। ওই গ্রামের কৃষক ফিরোজ মিয়ার মেয়ে তহুরা ফাইনালে হ্যাটট্রিক করে। এরপর অনূর্ধ্ব–১৬ এএফসি আঞ্চলিক পর্যায়ে ঢাকায় অনুষ্ঠিত টুর্নামেন্টেও চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ। সেই দলেও বেশির ভাগ খেলোয়াড় কলসিন্দুরের।
একটা গ্রাম থেকে, একটা প্রাইমারি স্কুল বছরের পর বছর এত ফুটবলার মেয়ের জন্ম দিচ্ছে কীভাবে? তা জানতে হলে আপনাকে পড়তে হবে ২০১৫ সালের ২২ আগস্ট প্রথম আলোয় প্রকাশিত কামরান পারভেজের প্রতিবেদন, ‘ফুটবল রাঙাচ্ছে কলসিন্দুরের মেয়েরা’। ২০০৯ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মেয়েরা ফজিলাতুন্নেছা কাপের জন্য দল গঠন করে। তাদের গুরু মফিজ স্যার। প্রথম ২ বছর তারা চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি। পরে আরও কঠোর পরিশ্রম আর অনুশীলনের মাধ্যমে তারা জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে কাপ গ্রহণ করে। ওই মেয়েরা বড় হয়ে কলসিন্দুর উচ্চবিদ্যালয়ে যায়। আর যোগ দেয় জাতীয় দলে।
অথচ ওদের প্রায় সবারই অভাবের সংসার। কারও মা রাস্তায় কাজ করেন। কারও বাবা রিকশা চালান। শ্রমজীবী কারও পরিবার। প্রথম আলো ২০১৫ সালে কলসিন্দুর গ্রামের ফুটবলার মেয়েদের নিয়ে প্রামাণ্য ছবি বানায়, রেদোয়ান রনির পরিচালনায় অদম্য মেয়েরা (দেখুন এই ঠিকানায়: https://goo.gl/cgI54c)। ওই সময় আমরা মেয়েদের জিজ্ঞেস করি, তোমরা কী চাও? ওরা বলে, দুপুরে পেট ভরে খেতে চাই। ‘আরে আরও বেশি কিছু চাও।’ ওরা বলে, ‘বেশি করে খাবার দিয়ে দিন, বাড়িতে সবাই মিলে খাব।’ এ বছর ঈদের সময় অনূর্ধ্ব–১৬ দলের মেয়েরা ঢাকায় ক্যাম্পে, ওদের ছুটি দেওয়া হয়নি। পরিচালিকা আপা আমাকে বললেন, ছুটি দিইনি কেন জানেন? ওরা ফিটনেস নষ্ট করে আসবে। আমি বললাম, মা বাড়িতে বেশি করে খাইয়ে মোটা বানিয়ে ছাড়বে? আপা বললেন, উল্টোটা। ওরা না খেয়ে ওজন হারিয়ে ফিরবে।
চোখে জল এসে যায়।
কলসিন্দুরের মেয়েদের নিয়ে প্রথম আলো প্রতিবেদন করেছে, প্রামাণ্য ছবি বানিয়ে বড় বড় মানুষকে দেখিয়েছে, প্রথম আলোর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে গত বছর ওরাই ছিল প্রধান আকর্ষণ। মেয়েরা আমাকে ঘিরে ধরল, আপনারা যে আমাদের নিয়ে ছবি বানিয়েছেন, ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার আমাদের গ্রামে তো বিদ্যুৎ নাই, আমরা দেখব কেমনে?
আমি বলি, যাও, ছয় মাসের মধ্যে বিদ্যুৎ যাবে। ওরা ঘিরে ধরে চিৎকার করে, না না, এক মাস। সেই কথা লিখে প্রচার করি, এক মাসের মধ্যে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ ওই গ্রামের ৮০০ বাড়িতে বিদ্যুৎ-সংযোেগর ব্যবস্থা করেন। মন্ত্রীর সঙ্গে আমিও যাই বিদ্যুতের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। ওরা এবার ধরে, আমাদের স্কুলঘর ভালো না। আমরা প্রামাণ্য ছবিটা দেখাই শিক্ষামন্ত্রীকে, নুরুল ইসলাম নাহিদ ওই স্কুলে ভবন তৈরি শুরুর ব্যবস্থা করে দেন।
আর ওই গ্রামের ২০ জন ফুটবলার মেয়েকে প্রথম আলো দেয় মাসিক বৃত্তি। এখন উদ্যোগ চলছে অনূর্ধ্ব–১৬ দলের অন্য মেয়েদেরও মাসিক বৃত্তি দেওয়ার, প্রথম আলোর ট্রাস্ট থেকে।
ওই গ্রাম, শিক্ষক, শিক্ষিকারা আমার আত্মীয় হয়ে গেছেন, মেয়েরা হয়ে গেছে আমার মেয়ের মতো। কিছু ঘটলেই ফোন, স্যার, আবার চ্যাম্পিয়ন হইছি। স্যার, খেলা দেখতে মাঠে আসেন। স্যার, সানজিদার বোনের বাড়িতে বিদ্যুৎ দরকার। স্যার, মারিয়ার বোনের বাড়িতে বিদ্যুৎ গেল না। (সানজিদা আর মারিয়ার বোনের বাড়িতে একটু বিদ্যুতের ব্যবস্থা কি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি করে দেবে!) কলেজের অধ্যক্ষের ফোন, জনাব, আমাদের হাইস্কুল ও কলেজটা সরকারীকরণের আবেদন করেছি, সরকারের কাছে আমাদের দাবিটা একটু তুলে ধরবেন।
আমি হাসিমুখে এসব ফোন রিসিভ করি, আর চেষ্টা করি ওদের আবদার পূর্ণ করতে। বাংলাদেশের গ্রামগুলো যেন প্রতিভার খনি। কলসিন্দুর সে আত্মবিশ্বাস দিয়েছে আমাদের। আর দিয়েছে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে বড় বড় সাফল্য। মারিয়ার মা এনতা মান্দার কথা মনে পড়ে, যখন গত বছর বিদ্যুৎ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম, উনি আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন, ছাড়তে চাইছিলেন না।
মেয়েদের এই অর্জনের পেছনে প্রথম আলোর কোনো কৃতিত্ব নেই। মেয়েরা খেলেছে, মফিজ স্যার, প্রধান শিক্ষিকা মিনতি রানী শীল, কলেজের অধ্যক্ষ জালাল উদ্দীন, ফিজিকাল টিচার উৎসাহ দিয়েছেন, আমরা খবর ছাপিয়েছি, সরকার টুর্নামেন্ট আয়োজন করেছে, এখন জাতীয় দলের প্রশিক্ষক গোলাম রব্বানী। আমাদের কাজ এই সাফল্যের খবর সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া। প্রথম আলো এতটুকুনই করে। হয়তো একটু বৃত্তি দেয়, হয়তো খোঁজখবর রাখে। সংবাদপত্রের চেয়ে একটু বেশি কাজ করে। কিন্তু ওদের সাফল্যে দেশের সব মানুষের মতো আমাদেরও চোখ ভিজে আসে। মনে হয়, ওরা তো আমাদেরই মেয়ে, আমাদের বাংলাদেশের মেয়ে।
আমাদের প্রিয় ক্রীড়ানুরাগী প্রধানমন্ত্রী এবং শিক্ষামন্ত্রী জনাব নূরুল ইসলাম নাহিদের কাছে অনুরোধ, ওদের কলেজটাকে সরকারি করা যায় কি না, প্লিজ, একটু দেখবেন।