আবার আলোচনায় অ্যাসিড-সন্ত্রাস

Acid_New_Logo_মানসুরা হোসাইন | আপডেট: ০০:৫৬, এপ্রিল ১৯, ২০১৬ | প্রিন্ট সংস্করণ
অ্যাসিড সহিংসতার বিষয়টি আবার আলোচনায় এসেছে। বেসরকারি সংগঠন অ্যাসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশনের (এএসএফ) সংগৃহীত তথ্য বলছে, চলতি বছরের শুরু থেকে গত ১০ এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে ১১টি অ্যাসিড আক্রমণের ঘটনায় ১৬ জন আক্রান্ত হয়েছেন। চলতি বছরে শুধু রাজধানীতেই আক্রান্ত হয়েছেন নয়জন। আক্রান্তদের মধ্যে একজন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। বরাবরের মতোই আক্রান্তদের মধ্যে নারীর সংখ্যা বেশি। আক্রান্ত ১৬ জনের মধ্যে ১২ জনই নারী। ১১টির মধ্যে নয়টি ঘটনায় মামলা করা হয়েছে।

অ্যাসিড-সন্ত্রাস প্রতিরোধ নিয়ে যাঁরা কাজ করতেন তাঁদের মতে, রাজধানীসহ সারা দেশে যে মাত্রায় ঘটছে বা এ ধরনের প্রবণতা চলমান থাকলে তা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
পত্রিকায় প্রকাশিত খবর এবং এএসএফের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি রাজধানীর মোহাম্মদপুরে বাড়ির সামনে এক গৃহিণী অ্যাসিডদগ্ধ হন। প্রতিবেশীর সঙ্গে বিরোধের জেরে তিনি দগ্ধ হন। ১১ জানুয়ারি সিরাজগঞ্জে গৃহিণীকে স্বামী অ্যাসিড মারেন পারিবারিক সমস্যার কারণে। ১২ জানুয়ারি জয়পুরহাটে এক ছাত্রী অ্যাসিডদগ্ধ হন। তিনি স্বামীকে তালাক দিয়ে বাবার বাড়িতে এসে আবার পড়াশোনা শুরু করেছিলেন। কিন্তু তালাক দেওয়ার পরও সাবেক স্বামী অ্যাসিড মারেন। ১৬ জানুয়ারি বগুড়ায় যৌতুকের দাবিতে স্বামী ও শাশুড়ি গৃহবধূ পূর্ণিমা আক্তারকে অ্যাসিড খাইয়ে দেন। ২৮ জানুয়ারি তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ১৭ জানুয়ারি ঢাকার আবদুল্লাহপুরে নেশার টাকা দিতে অস্বীকার করায় স্বামী অ্যাসিড মারেন। ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকার ডেমরায় স্বামী স্ত্রীকে অ্যাসিড মারেন পারিবারিক কারণে। ২৫ মার্চ হবিগঞ্জে তিন বোনকে অ্যাসিড মারা হয় জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধের কারণে। ৬ এপ্রিল চাঁদপুরের গৃহিণী বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে রাজি না হওয়ায়, ৭ এপ্রিল ঢাকার মিরপুরে পারিবারিক সহিংসতার জেরে একই পরিবারের তিনজন (দুই স্ত্রী ও এক সন্তান) এবং ১১ এপ্রিল টাঙ্গাইলের গৃহিণী জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধের কারণে অ্যাসিডদগ্ধ হন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে বর্তমানে ভর্তি আছেন অ্যাসিডদগ্ধ সীমা (২২)। রাতের বেলা ঘরে সিঁদ কেটে ঢুকে সীমার ওপর অ্যাসিড মারে দুর্বৃত্তরা। সীমার পাশেই তিন বছরের সন্তান ঘুমিয়ে ছিল। তার পায়েও অ্যাসিড লাগে। ৭ এপ্রিল থেকে সীমা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি।
সীমার মামা সোহাগ প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্বামীর সঙ্গে সীমার তালাক হয়ে গেছে। তারপর থেকে সীমা বাবার বাড়িতেই থাকে। এর মধ্যে এক যুবক সীমার সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক করার জন্য চেষ্টা চালাচ্ছিল। এখন কোন কারণে কে বা কারা অ্যাসিড মারল, তা সঠিকভাবে বলা যাচ্ছে না। ঘটনার পরই চাঁদপুরের মতলব থানায় মামলা করা হয়েছে।’ অন্যদিকে সীমার শারীরিক অবস্থা খুব খারাপ। মুখের অবস্থা খারাপ। চোখ দুটো প্রায় বের হয়ে গেছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, অ্যাসিড অপরাধ দমন আইন ২০০২ এবং অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ আইন ২০০২ থাকার পরেও আইনের কঠোর বাস্তবায়নের অভাবে এ সন্ত্রাস একেবারে বন্ধ করা যাচ্ছে না। এএসএফের পরিসংখ্যান বলছে, গত বছর ৫৯টি ঘটনায় ৭৪ জন অ্যাসিডদগ্ধ হন। ১৯৯৯ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত হিসাব বলছে, ৩ হাজার ৩০৩টি ঘটনায় ১ হাজার ৮৭৩ জন নারীসহ মোট ৩ হাজার ৬৬১ জন অ্যাসিডদগ্ধ হয়েছেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের অধীন গঠিত অ্যাসিড অপরাধ দমন মনিটরিং সেলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০২ থেকে ২০১৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত অ্যাসিড সহিংসতার ঘটনায় সারা দেশে মামলা হয়েছে ২ হাজার ১৯টি। মোট মামলায় অভিযুক্ত ৫ হাজার ৪১৭ জন। এর মধ্যে ৬৫৪ জন (মাত্র ১২ শতাংশ) গ্রেপ্তার হয়েছে। বাকি ৮৮ শতাংশ অভিযুক্ত পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে গেছে।
চলতি মাসের শুরুতে রাজধানীর মিরপুরে একই পরিবারের চারজন অ্যাসিডদগ্ধের ঘটনায় দেখা গেছে, শারীরিক, মানসিক এবং আর্থিক নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছিলেন স্ত্রী সুবর্ণা। স্বামী ভরণপোষণের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছিলেন না, এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল। পাশাপাশি স্ত্রীর পোশাকশিল্প কারখানায় কাজ করাও স্বামীর পছন্দ ছিল না। সুবর্ণা তাঁর স্বামীর তৃতীয় স্ত্রী। ভোরবেলা মুখোশধারী দুজন লোক ঘরে ঢুকে পরিবারের সদস্যদের অ্যাসিড ছুড়ে মারলে স্বামী সুরুজ আক্রমণকারীদের ধরার কোনো চেষ্টা করেনি। এ ঘটনায় সুরুজও কিছুটা অ্যাসিডদগ্ধ হন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকেই সুরুজকে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
এএসএফের নির্বাহী পরিচালক সেলিনা আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, রাজধানীর এ ঘটনায় সন্দেহ হওয়ায় স্বামী সুরুজকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। প্রথমে ভাবা হয়েছিল তিনিও এ ঘটনার শিকার। কিন্তু এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, অ্যাসিড নিক্ষেপকারীদের তিনিই ভাড়া করে এনেছিলেন। তাই অ্যাসিড-সন্ত্রাসের ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত জরুরি। এতে করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।