আর কত নিষ্ঠুরতা! এই হাসিমাখা মুখ এখন শুধুই ‘স্মৃতি’

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম | আপডেট: ০২:৩৬, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০১৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

বখাটের হামলায় কাঁধ থেকে ডান হাতটা প্রায় আলাদা হয়ে গেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের মরিয়মের। ​অ্যাসিডে ঝলসে গেছে চট্টগ্রামের শেলীর হাসিমাখা মুখ। অপমান সইতে না পেরে আত্মহননের পথ বেছে নিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ডালিয়া

মুঠোফোনে যে ছবিটি দেখা যাচ্ছে তা এক মাস আগের। হাসিমাখা এই মুখ আর কোনো দিনই হয়তো ফিরে পাবেন না শেলী। গতকাল তাঁর ঘুম ভেঙেছে দুর্বৃত্তের ছোড়া অ্যাসিডে। রাতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে তোলা ছবি l সৌরভ দাশমাকে নিয়ে ঝুপড়ি ঘরের বিছানায় ঘুমিয়ে ছিলেন ২২ বছরের শেলী আক্তার। হঠাৎ মুখ ও শরীরে তীব্র জ্বলুনিতে চিৎকার করে জেগে ওঠেন তিনি। পাশে শুয়ে থাকা মা হোসনে আরা বেগমও (৫৫) তখন আর্তচিৎকার করছেন। তাঁদের চিৎকারে পাশের ঘরে থাকা স্বজনেরা এগিয়ে আসেন। পরে শেলী ও তাঁর মা জানতে পারেন অ্যাসিড ছুড়ে মারা হয়েছে তাঁদের ওপর।

গতকাল সোমবার ভোর পাঁচটার দিকে চট্টগ্রাম নগরের পলোগ্রাউন্ড এলাকায় একটি বস্তিতে এ ঘটনা ঘটে। মা-মেয়ে দুজনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, শেলীর সাবেক স্বামী অটোরিকশাচালক মো. জাহাঙ্গীর বর্বর এ কাজ করেছেন। ঘটনার পর থেকে তিনি পলাতক।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ এস খালেদ বলেন, মেয়ের মুখসহ শরীরের ১৫ ও মায়ের শরীরের ১০ শতাংশ পুড়ে গেছে।

গতকাল বিকেলে বার্ন ইউনিটে গিয়ে দেখা যায়, হাতে, গলায় ও বুকে ব্যান্ডেজ বাঁধা অবস্থায় শুয়ে আছেন শেলী। মুখের এক পাশ পুড়ে যাওয়ায় কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিল তাঁর। হাত বাড়িয়ে মুঠোফানে নিজের হাসিমাখা একটি ছবি দেখান। পাশে থাকা এক স্বজন জানান, এক মাস আগে পারিবারিক এক অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে শেলীর এই ছবিটি তোলা হয়েছিল।

শেলীর মা হোসনে আরা বেগমের হাত ও পিঠ পুড়ে গেছে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কয়েক বছর আগে শেলীর সঙ্গে জাহাঙ্গীরের বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে তাঁর মেয়ের ওপর জাহাঙ্গীর নির্যাতন চালাতেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। এক বছর আগে শেলী তাঁর স্বামীকে তালাক দিয়ে চলে আসেন। যে বস্তিতে তাঁরা থাকেন তার পাশেই মা-মেয়ে মিলে চায়ের দোকান দিয়ে সংসার চালান। তালাকের প্রতিশোধ নিতে জাহাঙ্গীর অ্যাসিড ছুড়েছেন বলে তিনি ধারণা করছেন।

শেলীর বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে আলাদা থাকেন। তাঁরা তিন ভাই, তিন বোন। বড় দুই বোনের বিয়ে হয়েছে। তাঁরা কুমিল্লায় থাকেন। বড় দুই ভাই ভ্যান চালান। বস্তির পাশাপাশি তিন ঘরে থাকেন তাঁরা। সাড়ে তিন বছরের একটি ছেলে রয়েছে শেলীর। ছেলেটি আগের স্বামীর কাছে থাকে।

প্রতিবেশী ও পুলিশ সূত্র জানায়, রোববার রাত সাড়ে ১০টার পর দোকান বন্ধ করে মা-মেয়ে ঘরে ফেরেন। রাতে খেয়ে তাঁরা ঘুমিয়ে ছিলেন। ভোর পাঁচটার দিকে বেড়ার ঘরের ফাঁকা অংশ দিয়ে বিছানার দিকে অ্যাসিড ছুড়ে মারেন জাহাঙ্গীর। ঘটনাস্থলের পাশ থেকে তাঁর সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি জব্দ করেছে পুলিশ।

হাসপাতালে যন্ত্রণায় কাঁতরাতে থাকা মা হোসনে আরা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এক দিন রোজগার না করলে আমাদের খাবার জোটে না। এখন কে আমাদের চিকিৎসার খরচ দেবে?’

জাহাঙ্গীরকে খোঁজা হচ্ছে বলে জানান চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নূর মোহাম্মদ। গতকাল রাতে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, প্রাথমিকভাবে পুলিশ জানতে পেরেছে অটোরিকশা নিয়ে এসে জাহাঙ্গীর অ্যাসিড ছুড়ে পালিয়ে যান। অটোরিকশাটি জব্দ করা হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা করার প্রক্রিয়া চলছে।