আলো ছড়াচ্ছেন মারজিয়া

মাসুদ রানা, গাজীপুর

০৮ মার্চ ২০১৭, ০২:০৮
আলো ছড়াচ্ছেন মারজিয়া

‘অ্যাসিড-সন্ত্রাসের শিকার হয়ে বেশির ভাগ মেয়েই আর কাজে ফিরে আসতে পারে না। কিন্তু আমি তাদের মতো হতে চাইনি। লেখাপড়া করে ঘুরে দাঁড়িয়েছি। এখন আমি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। পাশাপাশি নিজের পড়াশোনাও চালিয়ে যাচ্ছি।’ এ কথাগুলো মারজিয়া আক্তারের। পারিবারিক শত্রুতার জের ধরে অ্যাসিড-সন্ত্রাসের শিকার হয়েছিলেন তিনি।
মারজিয়া আক্তার গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার টোকনগর গ্রামের আবুল কাশেমের মেয়ে। এখন টোক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। দিন কয়েক আগে বিদ্যালয়ের সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় গিয়ে মারজিয়াকে দেখা গেল ক্লাস নিতে। ওই ক্লাসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি জীবনে অনেক কষ্ট করেছি। যখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি, তখন শরীরে অ্যাসিড ছোড়া হয়। সেই অ্যাসিডে ঝলসে যায় গলাসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ। তখন ভেবেছিলাম, জীবন শেষ হয়েই গেল। হয়তো আর বাঁচব না, নয়তো পঙ্গু হয়ে বাঁচতে হবে।’ এসব কথা বলার সময় মারজিয়ার চোখ দুটি ছলছল করছিল।
২০০১ সালের ঘটনা। মারজিয়া আক্তার সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী। স্কুলে দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা চলছে। ভালো শিক্ষার্থী হিসেবে এরই মধ্যে সুনাম কুড়িয়েছেন স্কুলে ও পরিবারে। রাত ১১টা পর্যন্ত পড়াশোনা করে তিনি সবে ঘুমিয়েছেন। কিছুক্ষণ পরই হঠাৎ তীব্র জ্বালাপোড়া তাঁর মুখে।
ঘরের আলো জ্বালতেই দেখা গেল অ্যাসিড-সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন মারজিয়া। অ্যাসিড ছড়িয়ে পড়েছে মুখের নিচের অংশ থেকে গলা পর্যন্ত। এরপর এক বছর ধরে ঢাকায় অ্যাসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশনে চিকিৎসা নিতে হয়েছে তাঁকে। তবে পড়াশোনা ছেড়ে থাকতে পারেননি। হাসপাতালের বিছানায় বসেই পড়াশোনা করেছেন।
প্রথম দিকে নিজেকে নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তা হলেও পরিবারের অনুপ্রেরণা তাঁকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। মারজিয়া বলেন, ‘বড় বড় মানুষ আমাকে তখন উৎসাহ দিতেন। আস্থা পেতাম। তাই ইচ্ছা ছিল, যেভাবেই হোক পড়াশোনাটা শেষ করব।’
মারজিয়া ২০০৬ সালে এসএসসি পাস করেন কাপাসিয়া উপজেলার সূর্যবালা বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে। উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হয়েই অ্যাসিডদগ্ধ নারীদের জন্য প্রথম আলো ট্রাস্ট সহায়ক তহবিলের শিক্ষাবৃত্তি পান। ২০০৯ সালে শরীফ মমতাজউদ্দিন আহমেদ কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি আবেদন করেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায়। নিয়োগ পরীক্ষায় নিজের মেধার পরিচয় দিয়ে ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে চাকরি পান। যোগ দেন সহকারী শিক্ষক হিসেবে। ২০১২ সালে মারজিয়ার বিয়ে হয় একই গ্রামের মো. সাইফুল্লাহ লাবিবের সঙ্গে। তিনি নামিলা আনসারিয়া কামিল মাদ্রাসার ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক।
মারজিয়া বলেন, ‘বিয়ের পর থেকে আমার স্বামী ও তাঁর পরিবার আমাকে নানাভাবে সহযোগিতা করেছে। স্বামীর উৎসাহে শিক্ষকতার পাশাপাশি উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পড়ছি। ইচ্ছা আছে বড় কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করব।’
ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) আল আমিন বললেন, মারজিয়া ভালো শিক্ষক। শিক্ষার্থীরা তাঁকে খুব পছন্দ করে। মারজিয়ার স্বামীর বাড়িতে গিয়ে কথা হয় শাশুড়ি ফাতেমা আক্তারের সঙ্গে। তিনি বলেন, রান্নাবান্না থেকে তার সব কাজে আমরা সহযোগিতা করি। সেও আমাদের খোঁজখবর রাখে।’
তাঁর ছাত্রছাত্রীরা যখন ভালো ফল করে, মারজিয়ার খুব ভালো লাগে। একটু একটু করে অন্যের জীবনকে আলোকিত করতে চান মারজিয়া।