জীবনের জয়গান অ্যাসিডদগ্ধ নারীরা ফ্যাশন শোতে

মানসুরা হোসাইন

০৭ মার্চ ২০১৭, ০২:৩৭
প্রিন্ট সংস্করণ
অ্যাসিডদগ্ধ নারীরা ফ্যাশন শোতে

সাতক্ষীরার ১৩ বছরের কিশোরী সোনালী খাতুন। জন্মের পর মাত্র ১৮ দিন বয়সে তার এক প্রতিবেশী চাচা অ্যাসিড মেরেছিলেন। সোনালীর মুখের চেহারা আসলে কেমন ছিল তা এখন আর বোঝার কোনো উপায় নেই। একই ঘটনায় সোনালীর মায়ের একটি চোখ নষ্ট হয়ে গেছে। আর বাবাও অ্যাসিডদগ্ধ হয়েছেন।
সোনালীর বাবা নূর ইসলাম সরদার আর সোনালী এখন ঢাকায়। রাজধানীর আলো-ঝলমলে একটি হোটেলে এই বাপ-বেটি একসঙ্গে একটি ফ্যাশন শোতে অংশ নেবেন আজ মঙ্গলবার।
গতকাল সোমবার রাজধানীর মতিঝিলে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেলের অফিসে শুধু এই বাবা-মেয়ে নন, মোট ১৬ জন অ্যাসিডদগ্ধ নারী-পুরুষ বিভিন্ন গানের তালে তালে পা মেলাচ্ছেন। শুধু পা মেলানো না, গানের সঙ্গে নাচছেনও। ফ্যাশন শোতে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে আন্তর্জাতিক সংস্থা অ্যাকশন এইড বাংলাদেশ অ্যাসিডদগ্ধদের নিয়ে দেশে প্রথমবারের মতো ফ্যাশন শোর আয়োজন করেছে। ফ্যাশন শোটি পরিচালনা করছেন বিবি রাসেল। অ্যাসিডদগ্ধ ব্যক্তিরা হলেন অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের সহায়তায় অ্যাসিডদগ্ধদের নিয়ে গঠিত নেটওয়ার্ক ‘সেতুবন্ধন গড়ি’র সদস্য।
গতকাল চলছিল ফ্যাশন শোর চূড়ান্ত মহড়া। বিবি রাসেল নিজে সবাইকে দেখিয়ে দিচ্ছিলেন। মহড়া দিতে দিতেই বিবি রাসেল প্রতিবেদকের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘স্টেজে দেখবেন ওঁরা একা একা কী করে। মাত্র তিনবারের মহড়ায় এই মানুষগুলো যা করেছেন, আমি সত্যিই অভিভূত। ২৭ ঘণ্টা জার্নি করে দেশে ফিরে সরাসরি অফিসে এসে মহড়া করাচ্ছি। এঁদের নিয়ে কাজ করতে পারছি বলে অ্যাকশন এইডকে ধন্যবাদ। বলা যায়, আমার একটি স্বপ্ন পূরণ হলো।’
কেন এই আয়োজন—এ প্রশ্নের উত্তরে বিবি রাসেল বলেন, ‘তাঁদের মধ্যে যে সাহস আছে তাকে জাগিয়ে তুলতেই এ আয়োজন। বলা যায়, পৃথিবীর কোনো দেশেই এর আগে অ্যাসিডদগ্ধদের নিয়ে এ ধরনের আয়োজন হয়নি।’
সাতক্ষীরার গঙ্গা দাসী যখন মহড়া দিচ্ছিলেন, তখন গানের তালে নাচ দেখে যে কেউ ভাববে তিনি প্রতিনিয়তই নাচেন। এক মুখ হেসে জানালেন, জীবনে প্রথমবারের মতো সবার সামনে কোনো গানের সঙ্গে নাচছেন। গর্ভে মেয়ের বয়স যখন তিন মাস তখন স্বামী পালিয়ে গেছেন ভারতে, পরে মারাও গেছেন। গঙ্গা দাসী অনেক সংগ্রাম করে মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। গঙ্গা অ্যাসিডদগ্ধ হওয়ার কারণে সবাই তাঁর মেয়েকে বলত, ‘তোর মা খারাপ।’
১৯৮৮ সাল বা তারও আগের ঘটনা। জ্যোৎস্না বেগম বিয়ের ১৫ দিনের মাথায় অ্যাসিডদগ্ধ হন। স্বামী আগের স্ত্রী-সন্তানের কথা গোপন রেখে বিয়ে করেছেন, তাই দেখে জ্যোৎস্না ঘর করবেন না বলে জানান। এ অপরাধে স্বামী শাস্তি দেন। পরে আবার বিয়ে করেন জ্যোৎস্না। কিন্তু প্রায় ১১ বছর হলো ওই স্বামীও খোঁজ নেন না। তিন মেয়ে ও এক ছেলের মা জ্যোৎস্না বললেন, ‘এইখানে আইস্যা এগুলা কইরা খুব আনন্দ পাইছি।’
বরিশালের জেসমিন আক্তার এক চোখে দেখতে পান না। তাঁদের দোকানের কর্মচারী তাঁকে অ্যাসিড মারে। ২০০০ সালের ঘটনা। বর্তমানে জেসমিনের একটি মেয়ে আছে। এমএ পাস জেসমিন বললেন, ‘এখানে এসে সবার সামনে ফ্যাশন শোতে অংশ নেওয়ার জন্য মহড়া করছি। মনে অনেক সাহস পাচ্ছি। ভবিষ্যতে এই সাহসে ভর করে অনেকদূর যেতে পারব।’
সাতক্ষীরার সফুরাকে অ্যাসিড মারেন নিজের দেবর ও ভাশুর। সফুরা জানতেনই না, এভাবে জামাকাপড় গায়ে দিয়ে সবার সামনে হাঁটাই হচ্ছে একটা অনুষ্ঠান। তিনি বলেন, ‘ঢাকায় আসার পর যখন প্রথম জামা গায়ে দিই, কী যে ভয় পাইছিলাম। সারা রাত ঘুমাইতে পারি নাই।’
অ্যাকশন এইডে কর্মরত এবং অ্যাসিডদগ্ধদের নেটওয়ার্কের দায়িত্বপ্রাপ্ত অ্যাসিডদগ্ধ নুরুন্নাহার বললেন, ‘এই আয়োজনে সবাই মিলে অংশ নিতে পারায় খুব ভালো লাগছে।’
পাবনার কাকলী, সাতক্ষীরার নাসিমা, নার্গিস, কাসেদ আলী, ঈমান আলী, সাদেকুর রহমানসহ অন্যদেরও আছে জীবনের একেকটি গল্প। তবে তাঁরা যখন মহড়া দিচ্ছিলেন তখন মনে হচ্ছিল, তাঁরা তাঁদের অতীতকে ভুলে গেছেন বা ভুলে যেতে চান। মুখে হাসি কমে গেলেই বিবি রাসেল তা মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন।