প্রথম আলো ট্রাস্ট অদম্য মেধাবী : বিদ্যাসাগর ও বেগম রোকেয়ার উত্তরসূরিরা

 Adammo-Madhabi-Mnemonic-Final-[Converted]শুক্রবার রাত ১০টায় ট্রেন থেকে কমলাপুর স্টেশনে নেমেছিল বিধান কুমার। চারপাশে বিরাট বিরাট ভবন, আলো-আঁধারি রাজপথে ছুটছে শত শত গাড়ি। একটু একটু ভয় পেয়েছিল সে। জীবনে প্রথম এসেছে ঢাকায়। শুধু সে নয়, তার বাড়ির আর কেউও কখনো ঢাকায় আসেনি। বিধান এসেছিল তার এক সহপাঠীর বাবা শেখ আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে। তিনি তাঁর এক আত্মীয়ের বাড়িতে বিধানকে নিয়ে রাত কাটিয়ে সকালে অংশ নেন ‘প্রথম আলো’র অদম্য মেধাবী সংবর্ধনায়।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে নিজের অভিজ্ঞতার কথা যখন বিধান বলছিল, তখন অনেকেরই চোখ ভিজে উঠেছিল ওর কঠিন জীবনসংগ্রামের কাহিনি শুনে। নওগাঁর সুলতানপুর মহরমপাড়ায় তাদের বাড়ি। ওরা চার ভাই-বোন। বাবা দিনমজুর। বয়স হয়েছে। প্রায়ই অসুস্থ থাকেন। যেদিন কাজে যেতে পারেন না, সেদিন চুলায় হাঁড়ি চড়ে না। বড় ভাই সবুজ মণ্ডল নবম শ্রেণীতে পড়ত। অগত্যা পড়া ছেড়ে সবুজ এক মোটর গ্যারেজে কাজ শুরু করে। বিধান পড়া ছাড়ল না। কাজ নিল এক ইটের ভাটায়। খুব ভালো ছাত্র ছিল সে। শিক্ষকেরা ওকে উত্সাহ দিলেন। সাহায্য করলেন পড়ালেখায়। সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেন সহপাঠী ও তাদের অভিভাবকেরা। স্কুল ছিল বাড়ি থেকে ছয় মাইল দূরে। যখন বিধান নবম শ্রেণীতে উঠল, তখন সহপাঠীরাই তাকে একটি সাইকেল কিনে দিয়েছিল। সেই সাইকেলে করে স্কুলে যাতায়াত করত। কিন্তু সংসারের অন্য খরচ তো আছে। সেই খরচ মেটাতে ইটভাটার কাজটি করেই যেতে হচ্ছে তাকে। এর মধ্য দিয়েই পড়ালেখা চালিয়ে এবার এসএসসিতে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে বিধান। তার ইচ্ছা ভবিষ্যতে চার্টার্ড অ্যাকাউনটেন্ট হওয়া।

গতকাল শনিবার সকালে শনিবার ব্র্যাক ব্যাংক- প্রথম আলো ট্রাস্টের পক্ষ  থেকে ‘প্রথম আলো’র কার্যালয়, কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউর সিএ ভবন মিলনায়তনে অদম্য মেধাবীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে কঠিন জীবনসংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেসব শিক্ষার্থী এসএসসি ও এইচএসসিতে কৃতিত্ব অর্জন করছে, ‘প্রথম আলো’ তাদের সম্মান জানিয়েছে ‘অদম্য মেধাবী’ অভিধায়। গতকাল এমন ৭৬ জন অদম্য মেধাবীকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। এর মধ্যে এ বছর এসএসসিতে জিপিএ-পাঁচ পাওয়া ৫০ জন ও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া ২৬ জন। ২০১১ সালে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া যে ৫০ জন অদম্য মেধাবীকে শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হয়েছিল, তাদের মধ্যে এই ২৬ জন এবার এইচএসসিতেও জিপিএ-৫ পেয়ে নিজেদের কৃতিত্ব অব্যাহত রেখেছে। এবার উচ্চতর শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হলো এই ২৬ জনকে।

বেশভূষা ওদের  মলিন। কিন্তু চোখেমুখে দৃঢ়প্রত্যয়, আর সোনালি স্বপ্নের দীপ্তি। কারও স্বপ্ন চিকিত্সক হওয়ার।কেউ বুক বেঁধেছে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ হওয়ার আশায়।কেউ হতে চায় প্রকৌশলী, কেউ বা আগ্রহী শিক্ষকতার মহান ব্রত গ্রহণে।পুরো আয়োজনই ছিল প্রতিকূল পরিস্থিতি জয় করে স্বপ্নপূরণের দৃঢ়সংকল্পে দীপ্ত।অদম্যরা প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে মাদক ও এসিড সন্ত্রাসকে ‘না’ বলার।প্রত্যয় জানিয়েছে নিজেকে যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলে দেশ ও মানুষরে জন্য অবদান রাখার।

অনুষ্ঠানের শুরুতে ‘প্রথম আলো’র সহযোগী সম্পাদক আব্দুুল কাইয়ুম অদম্য  মেধাবীদের একালের ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও বেগম রোকেয়া হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি অদম্য মেধাবীদের শিক্ষাবৃত্তি দেওয়াসহ ‘প্রথম আলো’র নানা সমাজ ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড তুলে ধরেন। তিনি জানান, দেশের শিক্ষার্থীদের উত্সাহ ও অনুপ্রেরণা দিতে ‘প্রথম আলো’ তার যাত্রার শুরু থেকেই উদ্যোগ নিয়েছে। ১৯৯৯ সালে প্রথম সিরডাপ মিলনায়তনে এইচএসসি পরীক্ষায় কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সেখানে অনেকে ছিল, যারা দারিদ্র্যের বাধা অতিক্রম করে কৃতিত্ব অর্জন করেছিল। আলাদাভাবে অভিনন্দন জানানো হয়েছিল তাদের। ‘প্রথম আলো’র নিজস্ব তহবিল থেকে সেবার বেশ কয়েকজন দরিদ্র শিক্ষার্থীকে শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হয়।

সমাজের সুবিধাবঞ্চিত যে শিক্ষার্থীরা জীবনসংগ্রামের পাশাপাশি লেখাপড়া চালিয়ে কৃতিত্ব অর্জন করেছে, তাদের সাফল্যের কাহিনি নিয়ে ‘প্রথম আলো’র সাংবাদিকেরা ২০০৬ সাল থেকে নিয়মিত সংবাদ পাঠাতে থাকেন। ‘প্রথম আলো’ তাদের বলেছে ‘অদম্য মেধাবী’। অদম্যদের গল্প বহুজনকে তাদের প্রতি সহমর্মী করে তুলেছিল। ‘প্রথম আলো’ও ভেবেছে সংবাদ প্রকাশের মধ্যেই দায়িত্ব শেষ না করে তাদের জন্য কিছু করতে। এই ভাবনা থেকেই নেওয়া হয়েছিল অদম্য মেধাবীদের জন্য শিক্ষাবৃত্তি দেওয়ার উদ্যোগ।

প্রথম আলো ট্রাস্ট ২০০৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে অদম্যদের জন্য শিক্ষাবৃত্তি চালু করে। ব্যক্তিগতভাবে ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে অনেকে এগিয়ে আসেন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে। শুরুর দিকে ‘প্রথম আলো’র নিজস্ব তহবিল, ট্রান্সকম গ্রুপ, সামিট গ্রুপ, আমেরিকান অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সহায়তা দেয়। ব্যক্তিগতভাবে যাঁরা সহায়তা দিতে এগিয়ে এসেছিলেন, তাঁরা অনেকেই নাম প্রকাশ করতে আগ্রহী হননি। ২০১০ সাল থেকে ব্র্যাক ব্যাংক সংযুক্ত হয়েছে অদম্য মেধাবীদের শিক্ষাবৃত্তি দেওয়ার এই কার্যক্রমে। প্রথম দিকে শুধু এইচএসসি পর্যায়ের অদম্য মেধাবীদের দুই বছরের জন্য শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হতো। পর্যায়ক্রমে অদম্যদের শিক্ষাবৃত্তির আওতা আরও বেড়েছে। উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তি দেওয়া শুরু হয়েছে ২০১০ সাল থেকে। এ পর্যন্ত ৩৮৩ জন অদম্য মেধাবীকে শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হয়েছে।

অদম্য মেধাবীদের ২০০৯ সালে ঢাকায় ‘প্রথম আলো’র কার্যালয়ের সিএ ভবন মিলনায়তনে সংবর্ধনা ও শিক্ষাবৃত্তি দেওয়ার উদ্যোগ শুরু হয়। সেই ধারাবাহিকতায় এবার ছিল পঞ্চম আয়োজন। অদম্য মেধাবীদের সঙ্গে তাদের কারও অভিভাবক, কারও বা শিক্ষক এসেছিলেন এই সংবর্ধনায়। এসেছিলেন যাঁরা সাহায্য করেছেন, সেসব প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও ব্যক্তিরা। অত্যন্ত আবেগময় পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল অনুষ্ঠানে। অদম্য মেধাবীরা যখন তাদের কষ্টকর জীবনের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিচ্ছিল, তখন অনেকেই চোখের পানি সামলাতে পারেননি। অতিথিরা অদম্যদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করে পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছেন। অদম্যরাও  সেই আশ্বাসে নতুন করে জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যেতে সাহস ও শক্তিতে অনুপ্রাণিত হয়েছে।

গতকালের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। তিনি অদম্যদের অভিনন্দন জানিয়ে অনুপ্রেরণা দিয়ে বলেন, ‘পরীক্ষায় ভালো করাই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য নয়। তোমরা জ্ঞান দিয়ে মনটা বড় করবে। মনে যেন সংকীর্ণতা প্রবেশ করতে না পারে। সব সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠতে হবে। ভবিষ্যতে যখন তোমরা বড় হবে, তখন তোমরাও সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে। দেশকে প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু দেওয়ার আছে। তোমার ভেতরে যে ভালো দিকটি আছে, সেটিই দেশকে দিতে হবে। দেশকে বড় করে তুলতে হবে—এই প্রতিজ্ঞা নিয়ে তোমরা এগিয়ে যাও।’ তিনি ‘প্রথম আলো’ ও ব্র্যাক ব্যাংককে এই উদ্যোগের জন্য ধন্যবাদ জানান।

ব্র্যাক ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘তোমরা যে প্রতিকূলতা পেরিয়ে এসেছ, তা সমগ্র জাতির জন্য অনুপ্রেরণার উদাহরণ হতে পারে। আমরা তোমাদের সংবর্ধনা দিতে পেরে নিজেদেরই সম্মানিত বোধ করছি, অনুপ্রাণিত বোধ করছি। তোমরাই এ দেশের ভবিষ্যতের রূপকার। তোমাদের স্বপ্ন পূরণ হলে জাতিও উন্নতির দিকে এগিয়ে যাবে। তোমরা মানুষকে সাহায্য করবে, দেশের জন্য অবদান রাখবে, এই আমাদের প্রত্যাশা।’

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী অদম্যদের ফুলের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, ‘ফুলগুলো ফোটার সুযোগ করে দিতে হবে। যিনি যে অবস্থাতেই থাকুন না কেন, নিজ নিজ সামর্থ্য নিয়ে সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসতে হবে।’ তিনি অদম্যদের আলোকিত মানুষ হওয়ার অনুপ্রেরণা দেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের প্রকল্প পরিচালক সামন্ত লাল সেন গুরুত্ব দেন বাবা-মায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার প্রতি। তিনি অদম্যদের বলেন, ‘যে বাবা-মা তোমাদের অনেক কষ্ট করে মানুষ করছেন, তাদের সব সময় ভক্তি-শ্রদ্ধা করবে। যারা বাবা-মায়ের কথা যত শুনবে, তারা তত বড় মানুষ হবে।’

বার্জার পেইন্ট বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রূপালী চৌধুরী বলেন, ‘জ্ঞানই হচ্ছে সবচেয়ে বড় শক্তি। পাঠ্যবইয়ের বাইরে বিশাল জ্ঞানভান্ডার রয়েছে। তোমরা বেশি করে বই পড়বে। মনে রাখবে, জীবনে কখনো কখনো দুঃসময় আসতে পারে। কিন্তু কিছুতেই ভেঙে পড়বে না। আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে যাবে।’

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মোহিত কামাল অদম্য মেধাবীদের মাদককে ‘না’ বলার অঙ্গীকার করান। তিনি বলেন, ‘যে আত্মবিশ্বাস নিয়ে তোমরা শিক্ষায় কৃতিত্ব অর্জন করেছ, সেই আত্মবিশ্বাস নিয়েই সব অশুভকে “না” বলতে হবে।’

প্রথম আলো ট্রাস্ট ও সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আজিজ খান বলেন, ‘যার মেধা ও অদম্য ইচ্ছা আছে, তাকে কেউ আটকাতে পারে না। তোমাদের এই অদম্য মনোবল জাতির মধ্যে সঞ্চারিত হলে জাতি এগিয়ে যাবে। উন্নত হবে। তোমরা সত্য, সুন্দর ও মানবতার জন্য ভবিষ্যত্ জীবনে কাজ করে যাবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’

‘প্রথম আলো’র সহযোগী সম্পাদক আনিসুল হক অদম্য মেধাবীদের ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও বেগম রোকেয়ার জীবনের গল্প শুনিয়ে বলেন, ‘তোমাদের হূদয়ে যে আলো আছে, সেই আলো দিয়ে আরও অনেক আলো জ্বালাতে হবে। তাহলে সেই আলোয় সারা দেশ আলোকিত হবে।’

অনুষ্ঠানে আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে ছিল অদম্যদের জীবনসংগ্রামের অভিজ্ঞতা বর্ণনা, গান, জাদুর প্রদর্শনী।

অদম্য মেধাবী আবদুল খালেক তাঁর জীবনসংগ্রামের কথা তুলে ধরেন। খালেক ‘প্রথম আলো’র শিক্ষাবৃত্তি পেয়েছিলেন। এখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন। এ ছাড়া এসএসসিতে জিপিএ-পাঁচ পাওয়া বিধান কুমার, এইচএসসিতে জিপিএ-পাঁচ পাওয়া আবিদা জান্নাত তাঁদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। জাদু প্রদর্শন করেন জাদুশিল্পী উলফাত্ কবির। গান গেয়ে শোনান শিল্পী এস আই টুটুল। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলো ট্রাস্টের সমন্বয়কারী আজিজা আহমেদ।

অদম্য মেধাবীদের পদক প্রদান ও মধ্যাহ্নভোজের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এই আয়োজন।