ব্র্যাক ব্যাংক—প্রথম আলো ট্রাস্ট: অদম্য মেধাবী চোখে সোনালি স্বপ্নের দীপ্তি

দারিদ্র্য তাঁদের বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। হাজারো প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এসব শিক্ষার্থী এসএসসি ও এইচএসসিতে মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। গতকাল রাজধানীর সিএ ভবন মিলনায়তনে ব্র্যাক ব্যাংক-প্রথম আলো ট্রাস্টের পক্ষ থেকে এ রকম ৭৬ জন ‘অদম্য মেধাবী’ শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা দেওয়া হয় ষ ছবি: প্রথম আলো

দারিদ্র্য তাঁদের বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। হাজারো প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এসব শিক্ষার্থী এসএসসি ও এইচএসসিতে মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। গতকাল রাজধানীর সিএ ভবন মিলনায়তনে ব্র্যাক ব্যাংক-প্রথম আলো ট্রাস্টের পক্ষ থেকে এ রকম ৭৬ জন ‘অদম্য মেধাবী’ শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা দেওয়া হয় ষ ছবি: প্রথম আলো

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে কঠিন জীবনসংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেসব শিক্ষার্থী এসএসসি ও এইচএসসিতে কৃতিত্ব অর্জন করছেন, প্রথম আলো তাঁদের সম্মান জানিয়েছে ‘অদম্য মেধাবী’ অভিধায়। গতকাল শনিবার সকালে ব্র্যাক ব্যাংক-প্রথম আলো ট্রাস্টের পক্ষ থেকে প্রথম আলোকার্যালয়, কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউর সিএ ভবন মিলনায়তনে অদম্য মেধাবীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।এমন ৭৬ জন অদম্য মেধাবীকে গতকাল সংবর্ধনা দেওয়া হয়। এর মধ্যে এ বছর এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া ৫০ জন এবং এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া ২৬ জন। ২০১১ সালে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া যে ৫০ জন অদম্য মেধাবীকে শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হয়েছিল, তাঁদের মধ্য থেকে এই ২৬ জন এবার এইচএসসিতেও জিপিএ-৫ পেয়ে তাঁদের কৃতিত্ব অব্যাহত রেখেছেন। উচ্চতর শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হলো এই ২৬ জনকে।বেশভূষা ওদের মলিন। কিন্তু চোখেমুখে দৃঢ় প্রত্যয় আর সোনালি স্বপ্নের দীপ্তি। কারও স্বপ্ন চিকিৎসক হওয়ার, কেউ বুক বেঁধেছেন তথ্যপ্রযুক্তিবিদ হওয়ার আশায়। আবার কেউ হতে চান প্রকৌশলী, কেউবা আগ্রহী শিক্ষকতার মহান ব্রত গ্রহণে।প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম জানালেন, ১৯৯৯ সালে প্রথম সিরডাপ মিলনায়তনে এইচএসসি পরীক্ষায় কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সেখানে অনেকে ছিল, যারা দারিদ্র্যের বাধা অতিক্রম করে কৃতিত্ব অর্জন করেছিল। প্রথম আলোর নিজস্ব তহবিল থেকে সেবার বেশ কয়েকজন দরিদ্র শিক্ষার্থীকে শিক্ষা বৃত্তি দেওয়া হয়।প্রথম আলো ট্রাস্ট ২০০৭ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অদম্যদের জন্য শিক্ষাবৃত্তি চালু করে। ২০১০ সাল থেকে ব্র্যাক ব্যাংক সংযুক্ত হয়েছে এই কার্যক্রমে। প্রথম দিকে শুধু এইচএসসি পর্যায়ের অদম্য মেধাবীদের দুই বছরের জন্য শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হতো। ব্র্যাক ব্যাংক যুক্ত হওয়ার পর পর্যায়ক্রমে অদম্যদের শিক্ষাবৃত্তির আওতা আরও বেড়েছে। উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তি দেওয়া শুরু হয়েছে ২০১০ সাল থেকে। এ পর্যন্ত ৩৮৩ জন অদম্য মেধাবীকে শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হয়েছে। অদম্য মেধাবীদের সঙ্গে তাঁদের কারও অভিভাবক, কারও বা শিক্ষক এসেছিলেন এই সংবর্ধনায়। এসেছিলেন যাঁরা সাহায্য করেছেন, সেসব প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও ব্যক্তিরা। অত্যন্ত আবেগময় পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল অনুষ্ঠানে। অদম্য মেধাবীরা যখন তাঁদের কষ্টকর জীবনের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিচ্ছিলেন, তখন অনেকেই চোখের পানি সামলাতে পারেননি। অতিথিরা অদম্যদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করে পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছেন। অদম্যরাও সেই আশ্বাসে নতুন করে জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যেতে সাহস ও শক্তিতে অনুপ্রাণিত হয়েছেন।

গতকালের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। তিনি অদম্যদের অভিনন্দন জানিয়ে ও অনুপ্রেরণা দিয়ে বলেন, ‘পরীক্ষায় ভালো করাই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য নয়। তোমরা জ্ঞান দিয়ে মনটাকে বড় করবে। মনে যেন সংকীর্ণতা প্রবেশ করতে না পারে।’ তিনি প্রথমআলো ও ব্র্যাক ব্যাংকের এই উদ্যোগের জন্য ধন্যবাদ জানান।

ব্র্যাক ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘তোমরা যে প্রতিকূলতা পেরিয়ে এসেছ, তা সমগ্র জাতির জন্য অনুপ্রেরণার উদাহরণ হতে পারে। আমরা তোমাদের সংবর্ধনা দিতে পেরে নিজেদেরই সম্মানিত বোধ করছি, অনুপ্রাণিত বোধ করছি। তোমরাই এ দেশের ভবিষ্যৎ রূপকার।’

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী অদম্যদের ফুলের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, ‘ফুলগুলোকে ফোটার সুযোগ করে দিতে হবে। যিনি যে অবস্থাতেই থাকুন না কেন, নিজ নিজ সামর্থ্য নিয়ে সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসতে হবে।’

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক সামন্তলাল সেন, বার্জার পেইন্ট বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রূপালী চৌধুরী, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মোহিত কামাল, প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আনিসুল হক এবং প্রথম আলো ট্রাস্ট ও সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আজিজ খান।

অনুষ্ঠানে আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে ছিল অদম্যদের জীবনসংগ্রামের অভিজ্ঞতার বর্ণনা, গান ও জাদু প্রদর্শনী। সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী এস আই টুটুল, জাদু দেখান উলফাত কবির। অদম্য মেধাবী আবদুল খালেক তাঁর জীবনসংগ্রামের কথা তুলে ধরেন। তিনি প্রথম আলোর শিক্ষাবৃত্তি পেয়েছিলেন। এখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক। এ ছাড়া এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া বিধান কুমার, এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া আবিদা জান্নাত তাঁদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন।