স্বপ্নপূরণে পাশে থাকার প্রত্যয়

অতিথিদের সঙ্গে সংবর্ধিত অদম্য মেধাবী শিক্ষার্থীরা ছবি: প্রথম আলো

অতিথিদের সঙ্গে সংবর্ধিত অদম্য মেধাবী শিক্ষার্থীরা
ছবি: প্রথম আলো

জীবনের পথ কুসুম বিছানো থাকে না অনেকের। আজন্ম তাদের যেতে হয় কণ্টকময় পথ পাড়ি দিয়ে। অনেকে যেতে যেতে থেমে যায়। কেউ কেউ আবার দাঁতে দাঁত চেপে উঠে দাঁড়ায়, ভাগ্য নামের কুহেলিকার তোয়াক্কা না করে প্রবল প্রাণশক্তিতে এগিয়ে চলে আপন অভীষ্টের দিকে। তৈরি করে নেয় নিজের ভবিষ্যৎ।
জীবনপথের সেই সব দুর্দম অভিযাত্রী এসেছিল গতকাল প্রথম আলোয়। শুনিয়েছে বিরুদ্ধ প্রতিবেশের সঙ্গে তাদের নিরুপায় সংগ্রামের কাহিনি। বলেছে সাহস ও স্বপ্নের কথা। বাষ্পরুদ্ধ হয়েছে কারও কণ্ঠ। নেমেছে অশ্রুধারা। তবে তা অসহায়ের অক্ষম কান্না নয়, বরং তা ছিল গৌরবের মহিমায় ভাস্বর। তারা হাল ছাড়ার কথা ভাবেনি। ব্যক্ত করেছে কঠিন বাস্তবতার বিরুদ্ধে কঠোর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অটল সংকল্প। তাদের অনুপ্রেরণা দিতে এসে নিজেরাই অনুপ্রাণিত হওয়ার কথা বলেছেন সমাজের প্রতিষ্ঠিত জনেরা।
গতকাল বেলা ১১টায় সিএ ভবন মিলনায়তনে আয়োজন করা হয়েছিল সারা দেশের ২০১২ সালের এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া অতিদরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা। প্রথম আলো যাদের অভিহিত করেছে ‘অদম্য মেধাবী’ অভিধায়। ব্র্যাক ব্যাংক-প্রথম আলো ট্রাস্টের পক্ষ থেকে এ সংবর্ধনায় এসএসসির ৫০, ব্যক্তিগত উদ্যোগ-প্রথম আলো ট্রাস্টের পক্ষ থেকে পাঁচ ও এইচএসসির ৩৫—মোট ৯০ জন অদম্য মেধাবীকে সংবর্ধনা ও শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হয় এই অনুষ্ঠানে।
২০১০ সালে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া যে ৫০ জন অদম্য মেধাবীকে শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে এ বছর এই ৩৫ জন এইচএসসিতেও তাঁদের কৃতিত্ব ধরে রেখেছেন। তাঁদের দেওয়া হয় স্নাতকোত্তর পর্যায়ে উচ্চশিক্ষা বৃত্তি।
প্রথম আলো দেশের তরুণ শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করতে তার যাত্রার শুরু থেকেই বহুমাত্রিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। ১৯৯৯ সালে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে এইচএসসির কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল সিরডাপ মিলনায়তনে। সেই অনুষ্ঠানে দরিদ্র মেধাবীদের জন্য নিজস্ব তহবিল থেকে শিক্ষাবৃত্তি দিয়েছিল প্রথম আলো। সেই থেকে এক যুগেরও বেশি সময়ের পরিক্রমায় বহুধা বিস্তৃত হয়েছে শিক্ষার্থীদের জন্য প্রথম আলোর কার্যক্রম। দেশজুড়ে এসএসসির কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে নিয়মিত। অন্যদিকে অতিদরিদ্র শিক্ষার্থীদের প্রত্যয়দীপ্ত জীবনকাহিনি প্রকাশ এবং তাদের শিক্ষা অব্যাহত রাখতে নিয়মিত শিক্ষাবৃত্তি প্রবর্তন করা হয়। প্রথম আলোর সঙ্গে এই কার্যক্রমে এগিয়ে এসেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সমাজের অনেক সহূদয় ব্যক্তি ও বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান; যাদের মধ্যে ট্রান্সকম গ্রুপ, সামিট গ্রুপ, আমেরিকান অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন অন্যতম। ২০০৭ সাল থেকে নিয়মিতভাবে এসএসসির অদম্য মেধাবীদের শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া শুরু হয়। ব্র্যাক ব্যাংক এই কার্যক্রমে যুক্ত হয় ২০১০ সালে। তখন শিক্ষাবৃত্তির আওতাও বেড়ে যায়। এসএসসি পর্যায়ে বৃত্তি পাওয়া অদম্যদের মধ্যে যাঁরা এইচএসসিতেও কৃতিত্ব অক্ষুণ্ন রেখেছেন, তাঁদের জন্য স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বৃত্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রথম আলোর এই উদ্যোগ সাংবাদিকতার পাশাপাশি প্রথম আলোর সামাজিক অঙ্গীকারেরই অংশ। এই উদ্যোগ যে ফলপ্রসূ হয়েছে, তার প্রমাণ আবার যেমন পাওয়া গেল গতকাল সংবর্ধনায় আসা অদম্যদের কথায়, তেমনি অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানেরও এই ধারা অনুসরণের মধ্য দিয়ে।
আর গতকাল অদম্যরা বলছিল এসএসসি পর্যন্ত পেরিয়ে এলেও প্রথম আলোর এই সহায়তা না পেলে অনেকেরই উচ্চশিক্ষার পথ বন্ধ হয়ে যেত। যেমন—সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের দিনমজুর লিয়াকত হোসেনের মেয়ে লিপি খাতুন বলছিল, তার বড় বোন লতিফা খাতুনের পড়াই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। লিপি এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়ে শিক্ষাবৃত্তি পায়। সেই টাকায় নিজের খরচের সঙ্গে বড় বোনকেও ভর্তি করা হয়েছে এইচএসসিতে। লিপি এইচএসসিতেও এবার জিপিএ-৫ পেয়েছেন। তাঁর ইচ্ছা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে পড়বেন। আদর্শ শিক্ষক হবেন।
রাজশাহীর বাঘমারা উপজেলার সাজেদুর রহমান পানের বরজে কাজ করে। পান-লতা যে বাঁশের কাঠি জড়িয়ে বেয়ে ওঠে, তার আঞ্চলিক নাম ‘খিলকি’। ৮০টি খিলকির একটি আঁটি তৈরি করলে ২৭ টাকা ৫০ পয়সা মজুরি। এই মজুরি দিয়ে নিজের লেখাপড়ার খরচের সঙ্গে সংসারেও সাহায্য করতে হয়েছে তাকে। বাবা ওসমান আলী মণ্ডল বহুদিন ধরে শয্যাশায়ী। মা মাজেদা বেগম স্থানীয় হাসপাতালের আয়া। সাজেদুর ২০১০ সালে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়ে প্রথম আলোর শিক্ষাবৃত্তি পেয়েছিলেন। তাতে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে সুবিধা হয়েছে। এরই মধ্যে তিনি ২০১২ সালে এইচএসসিতেও পেয়েছেন জিপিএ-৫। ডাক্তারি পড়ার ইচ্ছা। কোচিং করার সামর্থ্য নেই। প্রস্তুতি নিয়েছেন নিজে নিজেই। মনে জোর আছে ভর্তি হতে পারবেন। বিকল্প লক্ষ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফলিত রসায়নে পড়া। এমন অদম্য সংগ্রামের কথা শুনে কে পারে নির্বিকার থাকতে! চোখ ভিজে গিয়েছিল অনেকেরই।
তবে সবকিছু ছাপিয়ে গেছে যখন অনুষ্ঠানের সঞ্চালক প্রথম আলোর ফিচার সম্পাদক সুমনা শারমীন মঞ্চে লালমনিরহাটের আবদুর রাজ্জাককে পরিচয় করিয়ে দিলেন। রাজ্জাকের গলায় সোনালি পদক। কিন্তু তিনি তা দেখতে পাচ্ছেন না। আরেক অদম্য চাঁপাইনবাবগঞ্জের আবদুল কাদের তাঁর হাত আঁকড়ে আছেন। রাজ্জাক বলছেন, তাঁর বাবা দিনমজুর। চার বছর বয়সে তাঁর দুই চোখের দৃষ্টি চলে যায়। লালমনিরহাটে ‘সমন্বিত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী’ নামের একটি সংগঠন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য স্কুল খোলে। পড়ালেখায় প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল তাঁর। ভর্তি হয়েছিলেন সেই স্কুলে। সেখান থেকেই ২০১০ সালে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছেন। প্রথম আলোর শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে আবার এইচএসসিতেও পেয়েছেন জিপিএ-৫। রাজ্জাকের কথা শুনতে শুনতে নিজের কষ্ট ভুলে নিঃশব্দে কাঁদছেন আবদুল কাদের। অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া অদম্য ও অতিথিরা বসে থাকতে পারেননি। আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে মুহুর্মুহু করতালি দিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন এই অপরাজেয় সংগ্রামীকে।
গতকালের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছিল আনন্দঘন পরিবেশে। সুরের ধারার শিল্পীরা শুরুতেই গেয়ে শুনিয়েছেন ‘আলো আমার আলো’ এবং ‘আলোকের এই ঝর্নাধারায়’ গান দুটি। এক পশলা বৃষ্টিও হচ্ছিল বাইরে তখন। শিল্পী কনা শোনালেন বৃষ্টির গান ‘ধিন তা না ধে রে না’।
সূচনা বক্তব্যে প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান অদম্যদের প্রেরণা দিয়ে বলেন, ‘প্রতিদিন ৬০ লাখের বেশি মানুষ প্রথম আলো পড়েন। এটি একটি অনেক বড় সামাজিক শক্তি। সেই শক্তি নিয়ে আমরা তোমাদের পাশে আছি। আমরা চাই দেশটা বদলাবে। আমাদের বিশ্বাস, তোমাদের অদম্য আত্মশক্তি পারবে দেশটা বদলে দিতে।’
ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘তোমাদের অদম্য সংগ্রামের কাহিনি আমাদেরও অনুপ্রাণিত করে। তোমরা এই অদম্য মনোভাব নিয়ে এগিয়ে যাও। স্বপ্নপূরণে আমরা তোমাদের পাশে আছি।’
এরপর এ বছর এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া ৫৫ জনের মধ্যে মেয়েদের মঞ্চে ডাকা হয়। তাদের অভিনন্দন ও প্রেরণা দিতে আসেন সেন্ট্রাল উইমেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য পারভীন হাসান, সানিডেল স্কুলের অধ্যক্ষ তাজিন আহমেদ এবং ২০১১ বিসিএস পরীক্ষায় প্রথম হওয়া ফারহানা জাহান ও অভিনয়শিল্পী নুসরাত ইমরোজ তিশা। অদম্যরাও তাদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে। ‘জন্মভূমি স্বপ্ন তুমি’ গানটি গেয়ে শুনিয়েছে ময়মনসিংহের হাসনা হেনা।
এরপর মঞ্চে আসে ছেলেরা। তাদের অভিনন্দন জানান অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চন, মনোরোগ চিকিৎসক মোহিত কামাল, জাদুশিল্পী জুয়েল আইচ, অভিনয়শিল্পী জাহিদ হাসান ও সংগীতশিল্পী বিপ্লব। গান শুনিয়েছেন বিপ্লব আর জাদু দেখিয়েছেন জুয়েল আইচ।
এইচএসসিতেও কৃতিত্ব ধরে রাখা ৩৫ অদম্যকে দেওয়া হয় কৃতিত্বের পদক। তাঁদের অভিনন্দন জানান প্রথম আলো ট্রাস্টের সভাপতি সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজিজ খান, ট্রাস্টের সদস্য ডা. সামন্ত লাল সেন ও প্রথম আলো মাদকবিরোধী আন্দোলনের উপদেষ্টা ব্রাদার রোনাল্ড ড্রাহোজাল ও আহমেদ হেলাল। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. আইনুন নিশাত, নটর ডেম কলেজের অধ্যক্ষ ফাদার বেঞ্জামিন ডি কস্তা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. সৈয়দ ফরহাত আনোয়ার অদম্যদের গলায় পদক পরিয়ে দেন। অদম্যদের তাঁরা উৎসাহ দিয়ে বলেন, ‘শুধুু মেধা থাকলেই হবে না, ভালো কিছু করতে হলে সঙ্গে অদম্য মনোবলও প্রয়োজন। তোমরা এই মনোবল হারাবে না। কোনো সহজ লাভের মোহে বা প্রলোভনে পড়বে না। তা হলেই জীবনে সত্যিকারের ভালো কিছু করতে পারবে। দেশের জন্যও অবদান রাখতে পারবে।’
অদম্যদের অনুপ্রেরণা দিয়ে ‘সোনালি প্রান্তরে’ গানটি গেয়ে শোনান গণিত অলিম্পিয়াড ২০১২ সম্মানসূচক পদক এবং চ্যানেল আই সেরা কণ্ঠের চ্যাম্পিয়ন মির্জা তানজিম শরিফ। অনুপ্রেরণা দেন প্রথম আলো ট্রাস্টের সহায়তায় শিক্ষা শেষে এখন আত্মপ্রতিষ্ঠিত অদম্য মেধাবী শাহাদৎ ফয়েজ। অনুষ্ঠানে ম্যাডোনা গ্রুপের প্রধান মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ের দাতারাও উপস্থিত ছিলেন। সমাপনী বক্তব্য দেন প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম।
পদক দেওয়া, অতিথিদের সঙ্গে ছবি তোলা, মাঝে মাঝে নিজেদের কথা বলা, গান শোনার মধ্য দিয়েই এগিয়েছে এই আয়োজন। তবে পুরোটা সময়ই থাকল ‘আমরা পেরেছি’ আমরা পারব’ এই আত্মপ্রত্যয়ের দীপ্তি।